করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট কিছু গুজব কিছু অদ্ভুত ঘটনা

চীনের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস যতোটা ছড়িয়েছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়েছে নানা রকম গুজব। করোনার বাহক, ছড়িয়ে পড়া ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুজবে সয়লাব।

করোনার এই সংকটকালে ভাইরাসকেন্দ্রীক নানা গুজব প্রতিনিয়ত ডালপালা ছড়াচ্ছে। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। এরকমই কিছু গুজব এবং অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।

রাশিয়ার রাস্তায় সিংহ কেন?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীরা একটি সিংহের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘রাশিয়ায় নাগরিকদের ঘরে বন্দি করে রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে ৮০০ সিংহ রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে নাগরিকরা হোম কোয়ারাইন্টান বা ঘরে থাকতে বাধ্য হয়।’

প্রকৃতপক্ষে যে ছবিটির মাধ্যমে এই গুজব ছড়ানো হচ্ছে সেটি রাশিয়ায় তোলা নয়। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে তোলা ২০১৬ সালের ছবি। বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম ডেইলি মেইল ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল ছবিটি প্রকাশ করে জানায়, মধ্যরাতে জোহনেসবার্গের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এই সিংটিকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সিংহটি পোষা। স্থানীয় একটি প্রডাকশন হাউস বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ের জন্য কলম্বাস নামের সিংহটিকে ভাড়া করে এনেছে। শুটিং চলাকালিন এটি রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

করোনাকালে যারা নিয়ম মানছেন না তাদের জন্য এই ছবি

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, একজন সৈনিক একটি গাধাকে পিঠে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা: ‘যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্যরা গাধাটিকে পিঠে তুলে নিয়েছিল নিজেদের প্রয়োজনে। কারণ গাধাটি যদি ভুল পথে হেঁটে যেত, তবে রাস্তায় পেতে রাখা লুকানো মাইন বিস্ফোরণে সবাই বিপদে পড়ত। বিস্ফোরণে মৃত্যুর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সৈনিকটি গাধাকে পিঠে তুলে নিয়েছে। তাই করোনা সংক্রমণের এই সময়ে যারা নিয়ম মানছেন না তাদের এই গাধার মতো নিয়ন্ত্রণ করুন। যাতে আপনি নিজেকে এবং আশেপাশের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে পারেন।’

এই ছবির ক্যাপশনের প্রতীকী অর্থ সত্য হলেও মূল ঘটনা আদৌ এরকম নয়। নিজেদের মাইন থেকে বাঁচাতে নয়, স্রেফ মানবিক কারণে গাধাটিকে সৈনিকরা পিঠে তুলে নিয়েছিল। ছবিতে দেখানো জায়গাটা হলো, আলজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমের খেনচেন অঞ্চল। ১৯৫৮ সালে এই স্থানে যুদ্ধের পর গাধাটিকে উদ্ধার করে একজন হারকা সৈন্য। গাধাটিকে উদ্ধার করে নাম দেয়া হয় বাম্বী। পরে এই ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর হইচই পড়ে যায় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে ছবিটি প্রকাশিত হতে থাকে।

রাস্তায় টাকা, কিন্তু কেন?

ফেসবুকে রাস্তায় ডলার পড়ে থাকার কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ছবিগুলো শেয়ার দিয়ে ক্যাপশন দিয়েছেন, ‘ইতালিয়ানরা রাস্তায় এভাবেই ডলার ছড়িয়ে বিশ্ববাসীর জন্য একটি ম্যাসেজ দিতে চাইল, টাকাই জীবনের সবকিছু নয়।’ যারা এই ক্যাপশনে ছবিগুলো শেয়ার দিয়েছেন, তারা বোঝাতে চেয়েছেন, রাস্তায় ডলারগুলো ছড়িয়েছেন ইতালির মানুষ। যারা এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন ডলার বা টাকায় কিছুই হয় না। প্রকৃতপক্ষে, এই ডলার বা টাকাগুলো পড়ে ছিল ভেনিজুয়েলার রাস্তায়। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশটির মূদ্রাস্ফীতির কারণে এমনটি ঘটেছে। রাস্তায় ডলারের বা ভেনিজুয়েলার টাকা (প্রেট্রোর) ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ে গত ১২ মার্চ টুইটারের মাধ্যমে। সমাজতান্ত্রিক দেশ ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এতই খারাপ হয়ে গেছে যে, জনগণ তাদের অর্থ ফেলে দিচ্ছে। কারণ, ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে এগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।

করোনার ভয় দেখাতে কবর খুঁড়েছেন মেয়র

না এটি গুজব নয়। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন দেশে নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অন্যান্য নিয়ম নীতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে সঙ্গনিরোধ বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা এই নিয়ম মানছেন না। ঘরের বাইরে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই ধরনের লোকেদের ভয় দেখিয়ে ঘরবন্দি রাখার জন্য ইউক্রেনের ডিনিপ্রো শহরের মেয়র এক অদ্ভুত উদ্যোগ নিয়েছেন। মেয়র বরিস ফিলাটোবের নির্দেশে শহরের বাইরে বনভূমিতে বিশাল জায়গাজুড়ে কবরস্থান তৈরি করে ছয়শ কবর খোঁড়া হয়েছে। এ ছাড়া মরদেহ বহনের জন্য দুই হাজার ব্যাগও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীর হয়ে সমাবর্তনে সনদ নিলো রোবট

জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ‘বিজনেস ব্রেক থ্রু ইউনিভার্সিটি’। গত ৭ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই অনুষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হয়নি। স্থানীয় একটি হোটেলে আয়োজিত সমাবর্তনে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ স্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। সেই সমাবর্তনের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে মঞ্চে সমাবর্তন বক্তাসহ তিনজন শিক্ষক বসে আছেন। সামনে শিক্ষার্থীর বদলে রোবট দাঁড়িয়ে আছে। রোবটগুলোর হাতে স্নাতক সনদ। মাথায় আইপ্যাড যুক্ত করা। আইপ্যাডে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ছবি দেখা যাচ্ছে। রোবটগুলোর গায়ে সমাবর্তন গাউন এবং মাথায় হ্যাট। ঠিক যেন একজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে আছে।

করোনা ঘোড়া

মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে নানা রকম উপায় বের করছে মানুষ। সর্বসাধারণকে সচেতন করতে এবার এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেছে ভারতীয় পুলিশ। অন্ধ্র প্রদেশের প্যাপিলি টাউনের কুর্নুল জেলায় মঙ্গলবার এক পুলিশ কর্মী করোনা সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরছেন। তবে তার ওই ঘোড়ার শরীরজুড়ে ছিল করোনাভাইরাসের ছবি।

এক বাড়িতে আদরে আছে ‘করোনা’ ও ‘কোভিড’

করোনাভাইরাসের সংক্রম‌ণে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এই মহামা‌রি বিশ্বজু‌ড়ে আতঙ্ক তৈ‌রি ক‌রে‌ছে। চলমান এই আত‌ঙ্কের ম‌ধ্যেই পাওয়া গেল ব্য‌তিক্রম এক খবর। যমজ দুই নবজাতকের নাম রাখা হ‌য়ে‌ছে ‘করোনা’ ও ‘কোভিড’। ভারতীয় এক দম্পতি লকডাউন চলাকালে যমজ সন্তা‌নের বাবা মা হন। তারা মেয়ে শিশুর নাম ‘করোনা’ এবং ছেলে শিশুর নাম রেখেছেন ‘কোভিড’।

‘করোনা’ শব্দটিই নিষিদ্ধ করল যে দেশ

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘করোনাভাইরাস’। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যেন শব্দটি মিশে গেছে। কিন্তু শব্দটিই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তান। দেশটির নাগরিকদের জনসম্মুখে বিশেষ করে রাস্তাঘাট, বাস স্টপেজগুলোতে এই শব্দ নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো নাগরিক এই আইন অমান্য করে তবে তাকে জেল জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। এছাড়া করোনার এই সংকটময় মুহূর্তে আরো কিছু অদ্ভুত আইন করেছে দেশটি।

করোনা ছাড়াই কোয়ারেন্টাইনে ৭ বছর

বিশ্বব্যাপী ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দটি এখন মুখে মুখে। সাধারণত করোনার উপসর্গ দেখা যায়নি এমন ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা থাকা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে মনে পড়ে? উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা। গ্রেফতার এড়াতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একটানা সাতবছর এক বিল্ডিং-এ থেকেছেন। সেখান থেকে তিনি বের হননি। অ্যাসাঞ্জকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়। দূতাবাস ভবনের এক কোণার একটি কক্ষ তার শোবার ঘর এবং একইসাথে কাজের জায়গা হিসেবে প্রদান করা হয়। শুরুতে মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে তার শোবার ব্যবস্থা করা হয়। ঘর লাগোয়া একটি কিচেন এবং বাথরুম ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। অ্যাসাঞ্জ ওই ভবন থেকে ৭ বছর বের হননি।

Facebook Comments Box