তিন যুগে বটগাছ লাগিয়েছেন ৪ শতাধিক, অন্যান্য অর্ধলাখ

ইদ্রিস আলীর বয়স এখন ৬০ বছর। বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটি ১৮-১৯ বছর বয়স থেকে লাগিয়ে চলেছেন গাছ। গত তিন যুগে লাগিয়েছেন চার শতাধিক বটগাছ। যে পরিমাণ তাল, খেজুর ও অন্যান্য গাছ লাগিয়েছেন তার সংখ্যা হবে অর্ধলাখ।

বৃক্ষপ্রেমী ইদ্রিস আলী পাবনার ফরিদপুর উপজেলার চিথুলিয়া পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত বাদশা খানের ছেলে। গাছ লাগানোর নেশায় তার সঞ্চয় বলতে কিছু ছিল না। এজন্য বিয়ে করাও সম্ভব হয়নি। এখন তিনি অসুস্থ। মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেনের জোগান বাড়াতে গিয়ে বলতে গেলে এখন তিনি নিজেই ‘অক্সিজেন সঙ্কটে।’

মাত্র চার-পাঁচ বছর বয়সে বাবা মারা যান ইদ্রিস আলীর। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিলেও ফেল করেন। শিক্ষাজীবন থেমে যায়। শুরু হয় গাছ লাগানো। বটগাছ দিয়ে শুরু। বাড়ির অদূরে বড় বিলের ভিটায় একটি বটগাছ

লাগান। সেখানে আজ আরও বেশ কয়েকটি বটগাছের সঙ্গে তার লাগানো বটগাছটি পথিকের ছায়া দিয়ে চলছে।

ইদ্রিস আলী বাড়ির পাশে আরেকটি বটগাছ লাগান। সেই যে শুরু। আজ পর্যন্ত চলছে তার বটগাছ লাগানো। বিগত ৪০ বছরে চার শতাধিক বট গাছ লাগিয়েছেন।

ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, কবরস্থান, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, সরকারি অফিস, হাট-বাজার, বিভিন্ন রাস্তার মোড়, ঈদগাহ মাঠ ও সরকারি খালি জায়গায় যেখানে সুবিধা পেয়েছেন সেখানেই গাছ লাগানো শুরু করেন।

বটগাছ লাগানোর শুরুর দিকের কথা প্রসঙ্গে ইদ্রিস আলী বলেন, আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে বাড়ির পাশে বিশাল একটি বটগাছ ঝড়ে ভেঙে যায়। এতে তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এলাকাটি গাছশূন্য খালি খালি মনে হয়। তখন তিনি ভাবলেন সেখানে একটি বটগাছ লাগালেই ভালো হবে। লাগিয়ে দিলেন বটের চারা। মনে তার শান্তি ফিরে এল।

এরপর দেখেন গ্রামের ঈদগাহ মাঠের পাশে খালি জায়গা। সেখানেও একটি বটগাছের চারা লাগালেন। একদিন ফরিদপুর উপজেলা চত্বরে ঢুকতেই দেখেন জায়গা খালি। সেখানে বটের চারা লাগালেন।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গাছ লাগানোর পর এমনও মনে হতো কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটিয়ে আর লাগাব না। কিন্তু পছন্দমতো জায়গা দেখলে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত বটের চারা না লাগিয়েছি ততক্ষণ শান্তি পাইনি। মনের শান্তির জন্য বটের চারা লাগিয়ে আসছি।’

গাছ লাগানো শুরুর বেশ কয়েক বছর পর ২০০৩ সালে ইদ্রিস আলীর মা মারা যান। মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর রেডিওতে একটি গান শুনছিলেন ‘বটবৃক্ষের ছায়া যেমন, মায়ের স্নেহ লাগে তেমন’। তিনি জানান, এ গান শুনে তিনি নিজের জীবনের সঙ্গে মিল পেয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। সেদিন থেকে বটগাছ লাগানো বাদ দেয়ার কথা আর ভাবেননি।

ফরিদপুর উপজেলা সদর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রসারিত ঝুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বটগাছ। তার নিচে শ্রান্ত-ক্লান্ত মানুষ বিশ্রাম নিচ্ছেন।

ফরিদপুর উপজেলা সদরে হাটের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজিউদ্দিন খান স্মৃতি সংসদের সামনে পাওয়া গেল তিনটি বটগাছ। তার নিচে বিশ্রাম নেন হাটুরিয়ারা। অনেকে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটও বসান।

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফরিদপুর উপজেলা, চাটমোহর-বাঘাবাড়ী বিশ্বরোডের দুই পাশ, বড়াল নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নিজ গ্রাম চিথুলিয়া, সোনাহারা ত্রিমোহনী মোড়, ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন, বন্যাকান্দি খেয়াঘাট, বেড়হাউলিয়া ঈদগাহ, শিববাড়ী, নাদোবাড়ী, ঘোড়াচক, পার-ফরিদুপর, ডেবক, মাটকুড়া, কাশিপুর, হাদল মাদরাসা, সাভার, দীঘিরভিটা, জলসেবিটা, কাটাতলা, জলিশাভিটা, নেছড়াপাড়া বাজার, বনওয়ারীনগর বাজার, খলিশাদহ সোনার বাংলা ক্লাব, ডেমরা স্লুইস গেট, খাগরবাড়িয়া, ভদ্রনামি, বিলবকরি, শিরবাড়ী, হাটগ্রাম সোনালী সৈকতসহ আরও অনেক জায়গায় বট-পাকুড় গাছের চারা লাগিয়েছেন ইদ্রিস আলী।

উপজেলার কোথায় নেই ইদ্রিস আলীর গাছ? এ প্রতিনিধির সারাদিন কেটে যায় ইদ্রিস আলীর গাছ দেখতে দেখতে। আর বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটি বলতে থাকেন গাছ লাগানোর সময় বা তার আগে-পিছের কথা।

জানান, বাকি জীবনটাও তিনি গাছ লাগিয়ে পার করে দিতে চান। গাছের ছায়াতলে মানুষ বিশ্রাম নেয়। পাখিরা গাছের ফল খায়। এগুলো দেখলে মন ভালো হয়ে যায় ইদ্রিস আলীর।

বট চারা সংগ্রহ করেন কোথা থেকে? এমন প্রশ্নে ইদ্রিস আলী আলী জানান, কাছে-দূরে সব জায়গা থেকেই বটের চারা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া পুরোনো ভবন, তালগাছ বা মানুষের বাড়ি থেকেও চারা সংগ্রহ করেন। চারা লাগানোর পর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরেও দেন। চারার গোড়ায় মাটি দেন। এরপর কয়েকদিন চারায় পানি দেন।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আবু বাসেত জানান, ইদ্রিস আলী শুধু বটগাছ লাগান না, তিনি এর পরিচর্যাও করেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যান তার লাগানো গাছের কাছে।

ইদ্রিস আলী জানান, বটগাছ লাাগানোর প্রতি বিশেষ টান থাকলেও তিনি শুধু বটগাছ লাগাননি, লাগিয়েছেন তাল, খেজুরসহ নানারকম গাছ। গত তিন যুগে সেগুলোর হিসাব করলে অর্ধলাখ ছাড়িয়ে যাবে।

এসব গাছের পেছনে তার আয়ের সিংহভাগ চলে গেছে বলে জানান ইদ্রিস আলী। তার আয়ের একমাত্র উৎস হাটে লুঙ্গি সেলাই করা। হাট বসে সপ্তাহে দুদিন। লুঙ্গি সেলাই করে পাওয়া সামান্য টাকা গাছ লাগানো ও পরিচর্যার পেছনে চলে যায়। মাস গেলে হাতে টাকা থাকে না। বাড়িতে তার এক বোন থাকেন। তিনিও বিধবা ও অসহায়। তিনিই রান্না করে দেন ইদ্রিসকে। কখনো ইদ্রিস আলী নিজেই রান্না করে খান।

ইদ্রিস আলী জাগো নিউজকে জানান, একটা গাছ লাগানোর জন্য তার গড়ে ৩০০ টাকা খরচ হয়। ফরিদপুর বাজারে এক সময় জলিল মোল্লার দর্জির দোকানে কাজ করতেন। দিনে ১৫০-২০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু বর্তমানে শুধু দুদিন হাটবারে কাজ করছেন। আয় কমে গেছে, প্রায় সব টাকাই খরচ করেন গাছের পেছনে।

তিনি বলেন, এমনও হয়েছে বাড়ির নিজের গাছ বিক্রি করে বটগাছের যত্ন নিয়েছেন। তার কষ্ট টাকার অভাবে অনেক জায়গায় তিনি গাছ লাগাতে পারেননি। তার লাগানো গাছের মধ্যে বট-পাকুড়ের পাশাপাশি তাল, খেজুর, আম, জাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, বকুল ফুলের গাছও আছে। জানান, গাছ লাগানোর সময় অনেক জায়গায় বাধার সম্মুখীনও হয়েছেন। তাদের গাছের সুফল সম্পর্কে বুঝিয়ে গাছ লাগাতে হয়েছে। এখন তারা সুফল পাচ্ছেন।

ইদ্রিস আলীর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই বলে জানান। তবে গাছের ডালপালা যেন কেউ না কাটে। সবার কাছে তিনি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আসুন, সবাই গাছ লাগাই পরিবেশ বাঁচাই।’

আজীবন কেন চিরকুমার থাকলেন? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, মূলত আর্থিক দুরবস্থার কারণেই বিয়ে করা হয়নি। বাবা-মা না থাকায় বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালেই চলে গেছে।

এখন তার লাগানো গাছগুলোই তার সন্তানের মতো। এদের মধ্যেই জীবনের সুখ খোঁজেন। তবে মনে সুখ থাকলেও দেহে ধরা পড়েছে নানা রোগ। ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা ধরা পড়েছে। টাকা-পয়সা নেই বলে পাবনা শহরে গিয়েও চিকিৎসা করাতে পারেন না। ফরিদপুরেই চিকিৎসা নেন।

থাকেন চিথুলিয়া পূর্বপাড়ায় জীর্ণ-শীর্ণ কুটিরে। কুটির বলতে একটি ছোট ছাপরা। তবে একটি প্রতিষ্ঠান তার দু’কক্ষের একটি ঘর তৈরি করে দিচ্ছে। সেখানেও বেধেছে বিপত্তি। করোনার জন্য নির্মাণকাজ বন্ধ বলে তিনি সেই ‘ওয়াল ঘরে’ উঠতে পারছেন না। তিনি জানান, বাথরুমসহ সামান্য কিছু কাজ বাকি।

বনওয়ারীনগর গ্রামের ইউসুফ আলী মোল্লা জানান, গাছপাগল ইদ্রিস আলীকে সবাই এক নামেই চেনে। গাছ ছাড়া তিনি যেন কিছুই বোঝেন না। বিয়ে-শাদি কিছুই করলেন না। গাছই তার ছেলেমেয়ে।

স্থানীয় কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, “শুধু আমাদের এখানেই নয়, বহু জায়গায় গাছপাগল ইদ্রিস বটগাছ লাগান। আমরা তাকে ‘গাছপাগল’ বলেই চিনি। জীবনটা তিনি এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছেন।”

ফরিদপুর হাটের চা দোকানি হযরত আলী বলেন, ‘ইদ্রিস ভাইয়ের লাগানো বটগাছের নিচে চায়ের দোকান দিয়েছি। মানুষজন ছায়ায় এসে বসেন, চা পান করেন।’

ইদ্রিস আলীর একমাত্র বোন আসমা খাতুন জানান, তিনি বিধবা। তার একটিমাত্র মেয়ে। মেয়েরও বিয়ে হয়েছে। তিনি হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন করে সংসার চালান। তার মেয়েটি এসে বাজার-ঘাট করে দেয়। তিনি নিজেই অসহায় বলে জানান। এর ওপর তার ভাই ইদ্রিস আলীকেও দেখাশোনা করতে হয়। রান্না করে দিতে হয়।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাইটি অসুস্থ। যদি কেউ কিছু সহযোগিতা করতেন তবে ভাইয়ের উপকার হতো।’

পাবনার ফরিদুপর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল হাফিজ বলেন, ইদ্রিস আলী সারাটি জীবন গাছ লাগিয়ে চলেছেন। তার লাগানো বটগাছের চারাগুলোর মতো তারও বয়স বেড়েছে। তিনি অসুস্থ হয়ে গেছেন। তিনি খাবার ও চিকিৎসা সঙ্কটে রয়েছেন। কিন্তু মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু বলেন না। তার জন্য সবাই একটু একটু সহায়তা করলে শেষ জীবনটা একটু ভালো কাটবে।

Facebook Comments Box