মুহতামিমের স্ত্রীর টাকা হারানোয় ভয়ে মাদ্রাসার জানালা দিয়ে পালায় ৩ ছাত্রী

জামালপুরের ইসলামপুরে আবাসিক একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার মুগদায় মান্ডা বস্তি থেকে তিন শিশু ছাত্রীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

শুক্রবার বিকালে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন পুলিশ সুপার মো. নাছির উদ্দিন আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মুহতামিম মো. আসাদুজ্জামানের স্ত্রীর এক হাজার টাকা হারিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই মাদ্রাসার শিক্ষক ও অন্য ছাত্রীরা তাদের সন্দেহ করে। এতে নিজেদের অসহায় মনে করে ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে কৌশলে মাদ্রাসার জানালা দিয়ে ওই তিন ছাত্রী পালিয়েছিল।

পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ভুক্তভোগী তিনজনই মেয়েশিশু এবং জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্টতাকে মুখ্য বিবেচনায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হলেও উদ্ধার হওয়া তিন শিশুর ভাষ্য অনুযায়ী নিখোঁজের ঘটনার সঙ্গে মাদ্রাসাটির গ্রেফতার চারজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানবপাচার বা জঙ্গিবাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

ইসলামপুর উপজেলার দারুত তাকওয়া মহিলা কওমি মাদ্রাসার তিন ছাত্রী ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হয়। তারা ওই মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বয়স ৯ থেকে ১১ বছরের মধ্যে।

এ ঘটনায় নিখোঁজ শিশুদের একজনের বাবা বাদী হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ইসলামপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার প্রধান আসামি মাদ্রাসাটির মুহতামিম মো. আসাদুজ্জামানসহ চারজন শিক্ষক জেলা কারাগারে আটক রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আরও জানান, ১২ সেপ্টেম্বর ওই মাদ্রাসার তিন ছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পেয়ে ইসলামপুর থানা পুলিশ তাদের উদ্ধারে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে ইসলামপুর পুলিশ কল্যাণ মার্কেটের সিসিটিভি ফুটেজে ওই তিন ছাত্রীকে ইসলামপুর রেলস্টেশনের দিকে যেতে দেখা যায়। তারা ট্রেনে ঢাকায় যেতে পারে সন্দেহ হয় পুলিশের।

ওই ফুটেজের সূত্র ধরে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. সুমন মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ১৬ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ কমলাপুর রেলস্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় ওই তিন ছাত্রীকে স্টেশন থেকে বের হতে দেখা যায়।

পরে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাজা মিয়া (১৪) নামের এক রিকশাচালক ওই তিন ছাত্রী সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দেয়। রাজা মিয়া ওই তিন ছাত্রীকে স্টেশন এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখে তাদের কাছে জানতে চায় তারা কোথায় যাবে।

তখন ওই তিন ছাত্রী তাকে জানায়- তাদের বাবা-মা বেঁচে নেই। তারা ঢাকায় কাজ করবে বলে বাড়ি থেকে না বলে পালিয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনায় রাজা মিয়া তাদের রাজধানীর মুগদার মান্ডা বস্তিতে দেড় হাজার টাকায় একটি ঘর ভাড়া করে দেয়। তিন শিশুর মধ্যে দুইজনকে স্থানীয় এক পোশাক কারখানায় কাজও নিয়ে দেয় রাজা মিয়া।

রাজা মিয়া তাদের কোনো ক্ষতি করেনি। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করেছে সে। মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়লেও তিনজনই সুস্থ আছে। রাজা মিয়ার তথ্যমতে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে মান্ডা বস্তি থেকে ওই তিন ছাত্রীকে উদ্ধার করে শুক্রবার সকালে তাদের জামালপুরে নিয়ে আসা হয়।

তিনি আরও জানান, ওই তিন ছাত্রী শিশু বয়সের হওয়ায় এবং আবাসিক কওমি মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আমরা খুব চাপে ছিলাম। তারা শিশু পাচারকারীর খপ্পরে পড়েছে, নাকি এর সঙ্গে জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্টতা আছে-এসব বিবেচনায় নিয়েই তদন্তে নামি। শিশু তিনটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার এবং তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচার বা জঙ্গিবাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

ওই মাদ্রাসার মুহতামিম মো. আসাদুজ্জামানের স্ত্রীর এক হাজার টাকা হারিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষক ও অন্যান্য ছাত্রীরা তাদের সন্দেহ করলে নিজেদের অসহায় মনে করে ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে কৌশলে মাদ্রাসার জানালা দিয়ে তারা পালিয়েছিল।

সাংবাদিক সম্মেলনের পর ওই তিন শিশুকে আদালতে হাজির করে ২২ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিশুদের ফিরে পেয়ে তাদের স্বজনদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

তিন ছাত্রী নিখোঁজের ঘটনায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলায় জেলা কারাগারে আটক ওই মাদ্রাসার মুহতামিম মো. আসাদুজ্জামানসহ চারজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে- এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, একটি আবাসিক মাদ্রাসা থেকে তিন ছাত্রী পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে নি:সন্দেহে। তাদের মাদ্রাসাটি সরকারি অনুমোদনও নেই। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ইতোমধ্যে মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলার ধারা বদল করে তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলাটি চলমান থাকবে বলে জানান পুলিশ সুপার।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার ছাড়াও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম খান, সহকারী পুলিশ সুপার মো. সুমন মিয়া, ইসলামপুরের ওসি মো. মাজেদুর রহমান, জামালপুর সদর থানার ওসি মো. রেজাউল ইসলাম খান ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মাহমুদুল হাসান মোড়ল উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments Box