শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, আম ব্যবসায় ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা

দেশে আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা নওগাঁয় এখন পুরোদমে আম বেচা-কেনা শুরু হয়েছে। শুধু হাট-বাজারেই নয়, আমের ব্যবসার জন্য অনলাইনের ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গত বছর দেশে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে আম ব্যবসা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন বেশ কিছু উদ্যোক্তা। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও একঝাঁক তরুণ। তাঁদের অধিকাংশই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

নওগাঁর কিছু তরুণ উদ্যোক্তা গত বছর প্রথম অনলাইনে বাগান থেকে পাড়া আম অনলাইনের মাধ্যমে বাজারজাত করেছেন। ফলে নওগাঁর আমের যেমন সুনাম বজায় থাকছে, তেমনি ক্রেতারাও বাড়িতে বসে নওগাঁর বাগানের সুস্বাদু আমের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। গত বছর ভালো সাড়া পাওয়ায় এবার মৌসুম শুরুর আগে থেকেই নওগাঁর আমের গুণগান লিখে অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। ইতিমধ্যে হাট-বাজারের পাশাপাশি অনলাইনেও পুরোদমে শুরু হয়েছে আম কেনা-বেচা।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এ মৌসুমে নওগাঁয় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আম হচ্ছে। আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আম বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছে স্থানীয় প্রশাসন। অনলাইনে গত বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার আমের ব্যবসা করেছেন শতাধিক তরুণ উদ্যোক্তা। এবার আরও একঝাঁক নতুন উদ্যোক্তা অনলাইনে আম ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। অনলাইনে এবার প্রায় ৫০ কোটি টাকার আম ব্যবসা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘নওগাঁর সুস্বাদু আম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ খুলে আমের ব্যবসা শুরু করেছেন জেলার পোরশা উপজেলার কয়েকজন তরুণ আম ব্যবসায়ী। তাঁদের একজন ফয়সাল আহমেদ বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। গত বছর করোনা মহামারি শুরুর পর তিনি বাড়িতে চলে আসেন। বাড়িতে অলস বসে না থেকে কয়েকজন বন্ধু মিলে ফেসবুকে পেজ খুলে আম ব্যবসা শুরু করেন। গত বছর প্রায় দুই মাস প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় মণ করে আম অনলাইনে অর্ডার পেয়ে বিক্রি করেছেন। অনলাইনে আম ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল খুবই ভালো। গত বছর ১০ লাখ টাকার ওপরে আম বিক্রি করেছেন তাঁরা। এবার অনলাইনে আরও বেশি আম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এবারই প্রথম অনলাইনে আম ব্যবসা শুরু করেছেন এমন কয়েকজন নতুন উদ্যেক্তা জানান, নতুন ব্যবসা হলেও ভালো সাড়া পাচ্ছেন তাঁরা। ইতিমধ্যে অনলাইনে মার্কেটপ্লেস ও ফেসবুক পেজ দেখে আম নেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রেতাদের ফোন পাচ্ছেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার পেয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে আম কিনে কুরিয়ারের মাধ্যমে আম পাঠাচ্ছেন তাঁরা। তবে কুরিয়ার খরচ কম হলে তাঁদের সুবিধা হতো বলে মত তাঁদের।

কয়েকজন বন্ধু মিলে এবারই প্রথম আম ব্যবসা শুরু করেছেন নওগাঁর সাপাহার উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা কাজী রাহাত। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বাড়িতেই বসে ছিলেন। গত বছর অনলাইনে আম ব্যবসায় অন্যদের সাফল্য দেখে তাঁরা কয়েক বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আম ব্যবসার। ফেসবুকে নওগাঁর আম বাজার নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে ১৫ দিন ধরে তাঁরা প্রচার চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে আমের অর্ডার পেয়েছেন। ফেসবুক পেজ বা মুঠোফোনে অর্ডার পেয়ে গোপালভোগ ও লক্ষণভোগ জাতের ২০ থেকে ২২ মণ আম বিক্রি করেছেন তাঁরা। প্রতি মণ গোপালভোগ ও লক্ষণভোগ আম ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা।

আরেক তরুণ উদ্যোক্তা জামিল আহমেদ বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি গত বছর থেকে তিনি অনলাইনে আমের ব্যবসা করেছেন। ক্রেতাদের ভালো সাড়া পেয়েছেন। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে আমের গায়ে দাগ ও পোকা হয়েছে। আম বিক্রিতে এ কারণে একটু সমস্যা হয়েছিল। কারণ, অনলাইনে ক্রেতার বিশ্বাস বড় পুঁজি। তিনি সেই বিশ্বাস ধরে রাখছেন।

জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী নওগাঁয় গুটি জাতের আম ২০ মে থেকে সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ২৭ মে থেকে গোপালভোগ, রানিপসন্দ ও লক্ষণভোগ জাতের আম পাড়া শুরু হয়। এ ছাড়া ২ জুন থেকে হিমাসাগর ও ক্ষীরশাপাতি, ৪ জুন থেকে নাগ ফজলি, ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে, ফজলি ২০ জুন থেকে, ফজলি ও আশ্বিনা আম ৮ জুলাই থেকে সংগ্রহ শুরু হবে।

এ বিষয়ে নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল ওয়াদুদ বলেন, যাঁরা অনলাইনে আমের ব্যবসা করছেন, তাঁরা অধিকাংশই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা বেকার তরুণ ও যুবক। বাড়িতে বসে না থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আয়-রোজগার করছেন তাঁরা। এবার অনলাইনে আম ব্যবসা ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তাঁর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ‘অনেক তরুণ উদ্যোক্তা পরিবহনের খরচটা কমানো যায় কি না, সে বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পরিবহন খরচ কমানোর বিষয়ে কথা বলব।’

Facebook Comments Box